মেনু নির্বাচন করুন

ভালুকা কৃত্রিম কুমির প্রজনন কেন্দ্র

রাজন ভট্টাচার্য হিংস্র প্রাণী হিসেবে পরিচিত কুমির। এই জলজ প্রাণী নিয়ে রয়েছে নানা কল্পকাহিনী। আছে বেদনাদায়ক বাসত্মবতা। কারণ জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া থেকে শুরম্ন করে মানুষখেকো কুমির নিয়ে আছে বহু কল্পকথা যে কারণে কুমির নামটি অনেকের কাছেই আতঙ্ক। যদি এমন হয়, আপনার সামনেই প্রতিদিন ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য কুমির। মেজাজ শানত্ম। কারও কোন ৰতির মধ্যে নেই। বরং কুমির চাষ করে অর্থনৈতিক আয়ের সম্ভাবনা। তাহলে কেমন হবে। আদপে পৃথিবীর নানা দেশে চাষ করা হচ্ছে কুমির। এই প্রাণীর মাংস ও হাড়ের চাহিদা কম-বেশি সব দেশেই আছে। কুমির চাষ করলে সরকারী-বেসরকারী সব সেক্টর থেকেই ঋণ পাওয়া সম্ভব। বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও বাসত্মবতা হচ্ছে বর্তমানে কুমির আতঙ্কের কোন নাম নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশেও বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে কুমিরের। এখানেই শেষ নয়। কুমির রফতানিকারক দেশের তালিকায় আগামী মাসেই নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ! ২০১৪ সাল নাগাদ প্রতিবছর চার হাজার কুমির রফতানি করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতে আয় হবে তিন থেকে ৪০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে কুমির আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রসত্মাব দিয়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ৫০০-৬০০ মিলিয়ন ডলারের কুমিরের মাংসের বাজার রয়েছে। ২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে প্রায় ৪০ হাজার কুমিরের চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। ২০০১-০২ সালে সুন্দরবনের ৩০ হেক্টর জমির ওপর দেশে সর্বপ্রথম কুমির প্রজনন ও লালন-পালন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে।
বাণিজ্যিক চাষের শুরম্ন যেখানে ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলা থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে উথুয়া ইউনিয়নের হাতিবেড় গ্রাম এখন কুমির চাষের মডেল। বলতে গেলে দেশে প্রথমবারের মতো কুমির চাষে বিপস্নব এই গ্রাম থেকেই। বেসরকারী প্রতিষ্ঠান রেপটাইলস ফার্ম লিমিটেড ২০০৪ সালে কুমিরের খামার প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সহ আরেকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সহায়তায় গড়ে তোলা হয় এ খামার। ৭৫টি কুমির দিয়ে খামারের যাত্রা শুরম্ন। পরে কুমিরের ডিম থেকে কৃত্রিমভাবে বাচ্চা ফোটানো হয়। বর্তমানে এ খামারে কুমিরের সংখ্যা ৮২৫-এর বেশি। এর মধ্যে পনেরোটি পুরম্নষ। কুমিরের বৈজ্ঞানিক নাম-( ক্রোকোডিডিলাস পোরোসাস)। খামারে মোট কুমিরের মধ্যে ৬৭ বড় আকারের। চলতি বছর প্রজনন বাড়াতে আগামী বছর আরো ১০০ স্ত্রী কুমির আমদানি করবে খামার কতর্ৃপৰ। এ খামারে সব লোনা পানির কুমির। বিশ্বে লোনা পানির কুমিরের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০০৪ সালের ৫ মে এ খামার প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়। পরে উদ্যোক্তারা আনত্মর্জাতিক সংস্থা 'সিআইটিইএসে'র অনুমাদন নিয়ে মালয়েশিয়ার সারওয়াত থেকে সোয়া কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৫ কুমির আমদানি করে। ২০০৪ সালের ২২ মে কুমির খামারে ছাড়া হয় কুমির। হাতিবেড় এলাকায় কুমির চাষ প্রকল্প স্থাপনে ১৩ একর জমির মধ্যে চার একর জমির মাটি কেটে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ৩২ পুকুর তৈরি করা হয়েছে। পুকুরগুলোর তলদেশ পাকা। তিন ফুট ইটের ওপর তিন ফুট কাঁটাতারের বেষ্টনী। প্রাকৃতিক পরিবেশে কুমির পালন ও বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করার জন্য চারপাশে ৪০ প্রজাতির ছয় হাজার ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানো হয়েছে। লাগানো হয়েছে কৃত্রিম ঘাসও। কুমিরের খাবার হিসেবে দেয়া হচ্ছে মাছ ও মাংস।
দেশের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া কুমির চাষের উপযোগী। বলতে গেলে সবকিছুই অনুকূলে। সামান্য উদ্যোগ সম্ভাবনাময় কুমির চাষের বিসত্মৃতি ঘটতে পারে দ্রম্নত। যার মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে। অর্থনৈতিক মুক্তিও সম্ভব। তাঁরা বলছেন, কুমিরের গড় আয়ু ১০০ বছর। ডিম নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কম। বেশিরভাগ ডিম থেকেই বাচ্চা হয়। খামারের কুমির ৬/৭ বছর পর থেকেই ডিম দিতে শুরম্ন করে। খামারের বাইরে খোলা পানিতে চাষ করা হলে ডিম দিতে সময় লাগে ১৩/১৪ বছর। বাচ্চা ফুটতে সময় লাগে ৮০-৯০ দিন।
আগামী মাসে রফতানি শুরম্ন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই রফতানি পণ্যের তালিকায় যোগ হতে যাচ্ছে বিরল প্রজাতির পণ্য। দেশের একমাত্র কুমির চাষকারী খামার জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে কুমির রফতানি শুরম্ন করবে। প্রথম দফায় প্রায় এক শ' কোটি টাকার কুমির রফতানি করা হবে জার্মানিতে। রেপটাইলস ফার্ম কতর্ৃপৰ বলছে, প্রথম ধাপে রফতানি করা হবে ৭০-১০০টি কুমির। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কুমির রফতানিকারক দেশের তালিকায় প্রথমবারের মতো নাম লেখাবে। গত ১০ ডিসেম্বর এ সংক্রানত্ম একটি প্রসত্মাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সার্ক দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক কুমির চাষের একমাত্র খামার ভালুকার ময়মনসিংহে অবস্থিত।
উদ্যোক্তারা বলছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে কুমির চাষের দিক থেকে এটিই হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় খামার। বর্তমানে কুমির চাষের সবচেয়ে বড় খামার অস্ট্রেলিয়ায়। ২০১৪ সাল নাগাদ প্রতিবছর চার হাজার কুমির রফতানি করা সম্ভব হবে। এতে আয় হবে তিন থেকে চার মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশ থেকে কুমির আমদানির আনুষ্ঠানিক প্রসত্মাব দিয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, ২০১১-১২ সালের মধ্যে ভালুকায় কুমিরের খামার থেকে প্রতিবছর চার থেকে পাঁচ হাজার কুমিরের বাচ্চা বিভিন্ন দেশে রফতানি করা সম্ভব হবে।
বিশ্ব বাজার বিশ্ব বাজারে কুমিরের চাহিদা বেশ। মাংস, হাড় ও চামড়া_ এর কোন কিছুই ফেলে দেয়ার মতো নয়। সবকিছুই অর্থনৈতিক আয়ের উৎস। বিশ্বে বর্তমানে ৫০০-৬০০ মিলিয়ন ডলারের কুমিরের মাংসের বাজার রয়েছে। ২০০৮ সালে বিশ্ব বাজারে প্রায় ৪০ হাজার কুমিরের চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। চীন, জাপান, তাইওয়ান, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে কুমিরের মাংসের চাহিদা ব্যাপক। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, পাপুয়া নিউগিনি, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কোরিয়া, চীনসহ প্রায় অর্ধশত দেশে বাণিজ্যিকভাবে কুমিরের চাষ হচ্ছে। বর্তমানে থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ লোনা পানির কুমিরের চামড়া, হাড় ও মাংস যোগান দিচ্ছে। বিশ্বে সাত প্রজাতির কুমির চাষ হয়। এর মধ্যে লোনা পানির কুমির সবচেয়ে বেশি।
লবণ পানিতে কুমির চাষ সুন্দরবনের মধ্যে প্রায় দুই লাখ হেক্টর নদী ও নালায় লবন পানির কুমিরের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সংরৰণের উদ্দেশ্যে করমজল এলাকায় ৩০ হেক্টর জমির ওপর দেশে সর্বপ্রথম কুমির প্রজনন ও লালন-পালন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। জীববৈচিত্র্য সংরৰণ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০০১-০২ অর্থবছরে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, বন্যপ্রাণী ও টু্যরিজম বিভাগ খুলনার আওতায় অবকাঠামোগত নির্মাণের কাজ শেষ করে। এখানে বিলুপ্তপ্রায় তিন প্রজাতির কুমির আছে। বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় ১৫০ নদীতে প্রায় ২০০ কুমির আছে। যা ক্রমশ বিলুপ্তির পথে। কুমির প্রজনন কেন্দ্রের রোমিও-জুলিয়েট নামে একজোড়া কুমির দেশে বহুল আলোচিত। এই দু'টি কুমির ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিম দেয়, যা থেকে ষোলো বাচ্চা হয়। এরপর ২০০৬ সালে ডিম দেয় ৩৬, এর মধ্যে বাচ্চা মেলে ২৬ ডিম থেকে। ২০০৭ সালে ৪১ ডিম থেকে ২৯ বাচ্চা পাওয়া যায়। ২০০৮ সালে ফের ৪১ ডিম থেকে বাচ্চা মেলে ৩০। সর্বশেষ ২০০৯ সালে আবারও ৪১ ডিম থেকে ২৭ বাচ্চা পাওয়া গেছে। এদিকে ভালুকার ফার্ম থেকে ২০০৯ সালে সর্বশেষ প্রায় সাড়ে ৪০০ কুমিরের বাচ্চা জন্ম


Share with :

Facebook Twitter